মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

মুক্তিযুদ্ধে কক্সবাজার সদর

সেদিন ছিল ৩ মার্চ ১৯৭১, সময় বিকাল ৩ টা। পাকিস্তানের সাধারণ পরিষদে বিজয়ী আওয়ামীলীগকে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবীতে স্থানীয় আওয়ামীলীগের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই জনসভার সমর্থনে সকাল ১০ টায় মিছিল হয়। এই মিছিলে অংশগ্রহণকারী ছাত্রনেতা আল মামুন শামসুল হুদা (নান্নু) তালাবদ্ধ এসডিও অফিসের উপরে টাঙানো পাকিস্তানি পতাকাটি নামিয়ে ফেলে। দুপুরে অপর একজন ছাত্র একেএম মনসুর উল হক স্থানীয়ভাবে বাঙরাদেশের পতাকা তৈরী করেন। পূর্ব ঘোষিত সময়ে জনসভার শেষদিকে মনসুর উল হক জনসভা মঞ্চে উঠে পাকিস্তানি পতাকাটি পুড়িয়েঁ পেলেন এবং স্থানীয়ভাবে তৈরী করা পতাকাটি উত্তোলন করেন। কক্সবাজারের পাবলিক লাইব্রেরী ময়দানে উপস্থিত জনতা উল্লাসে ফেঠে পড়ে। এটা ছিল কক্সবাজারে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পদক্ষেপ। 

 

৭ ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষনের পর কক্সবাজার সদরে জেলা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়।

আবসার কামাল চৌধুরী (আহবায়ক)

এ.জহিরুল ইসলাম (নির্বাচিত এমপিএ)

এ.কে.এম মোজাম্মেল হক (প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন)

এড. নুর আহমদ (নির্বাচিত এমএনএ)

অধ্যক্ষ ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী (নির্বাচিত এমপিএ)

এ. মওদুদ আহমদ (কোষাধ্যক্ষ)

এড. সুরেশ চন্দ্র সেন

মোহাম্মদ ইদ্রিস

এস.কে শামসুল হুদা

ডাঃ শামশুদ্দিন

শমশের আলম চৌধুরী

নজরুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ। 

 

এই সংগ্রাম কমিটি জেলা পরিষদ ডাক বাংলোতে বসে কার্য পরিচালনা করতেন।

 

আর শহরের প্রবেশ মুখে কামাল হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে পিটিআই মাঠে 'জয় বাংলা বাহিনী' নামে আর একটি মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্প তৈরী হয়।

 

৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরতে ফরহাদ প্রায় ৫০ জন যুবক নিয়ে একটি প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তুলে চট্টগ্রামে বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনা করেন। যুদ্ধ কৌশল হিসেবে তিনি প্রথমে কালুরঘাট চলে আসেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ফরহাদ তার দলবল সহ কক্সবাজার চলে আসেন। ইতোমধ্যে হানাদার বাহিনীর হাতে কালুরঘাট পতন হয়। ৫ মে কক্সবাজার প্রবেশ করে হানাদার বাহিনীর ১১৫৩ গাড়ির বহর। অস্ত্র সংকট ও বিভিন্ন সমস্যার কারণে কক্সবাজারের অনেক গুরুত্বপুর্ণ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকরা বাধ্য হয়ে তখন বার্মায় আশ্রয় নেয় এবং সেখানে যুদ্ধের প্রস্তুতি ট্রেনিং ক্যাম্পে চলতে থাকে।

 

তারপর ৬ মে। কক্সবাজারের ইতিহাসের এক স্মরণীয় দিন। দেশীয় পাক দোসরদের হাতে থানায় বন্দি ছাত্রনেতা সুভাস, ফরহাদসহ ৭/৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে টেনে হিচড়েঁ নিয়ে যাওয়া হয় বাঁকখালী নদীর তীরে। তারপর সবাইকে লাইন করে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে খাঁঝরা করে দেয়া হয় সকলের বুক। গুলি খেয়েও ফরহাদ বেঁচে গেলো। ব্রাশ ফায়ার করে হানাদার বাহিনী স্থান ত্যাগ করলে ফরহাদ খুব কষ্টে সাঁতরিয়ে বাঁকখালী নদী পার হয়ে খুরুশকুলের কুলে উঠে।  কাতরাতে কাতরাতে একটি পাহাড়ের মসজিদের পাশে এসে হুমড়ে পড়ে।

 

এসময় জনৈক ব্যক্তি তাকেঁ উদ্ধার করে তাঁর বাড়িতে আশ্রয় দেয়। কিন্তু ওঁৎপেতে থাকা পাকিস্তানি দোসরদের হাত থেকে ফরহাদের শেষ রক্ষাও মেলেনি। সেখানকার আমির হামজা নামক জনৈক পাক দোসর শহরে হানাদার ঘাটিতেঁ খবর দিয়ে ফরহাদকে আবারও ধরিয়ে দেয়। ফরহাদ শেষ অনুনয় করেছিল পাক দোসরকে। না কাজ হয়নি কিছুতেই। যারা পাকিস্তানের কথা বলে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে আচরণ করে তাদের যেন মানবতা বলতে কিচু নেই তা ফরহাদ বুঝে নেয়। শেষবারে তাকে মারার জন্য এনে রাখা হয় কস্তুরাঘাটের বদরমোকামে। আল্লাহর কাছে শেষ চাওয়া চেয়ে নেয় ফরহাদ। আসরের নামাজ আদায় করেন বদরমোকাম মসজিদে। তারপর ক্ষিণস্থান মুখে, চোখে প্রচন্ড আক্রোশ আর বুকে স্বাধীনতার অদম্য স্পৃহা নিয়ে বেরিয়ে আসে মসজিদ থেকে। বুকে গুলির চিহ্ন। তখনো রক্ত ঝরছিল। হাটতে পারছিলোনা। সন্ধ্যের দিকে প্রকাশ্যে গুলি করে মারা হয়েছিল ফরহাদকে।

ছবি